rss
মঙ্গলবার, ২২ মে ২০১২
UKBDNEWS a part of International News Media Ltd
UKBDNEWS a part of International News Media Ltd
UKBDNEWS a part of International News Media Ltd
UKBDNEWS a part of International News Media Ltd
বিদায় হজ্জ এবং হযরত রাসূল করীম (সা.)-এর ভাষণ
মঙ্গলবার, 31 জানুয়ারী 2012 19:18

156957_468602957132_115158642132_6148737_3849932_n.jpgমাহমুদ আহমদ সুমন :: হিজরী নবম বর্ষে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহো তাআলা আলায়হে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় এলেন। সেদিন তাঁর উপরে কুরআন করীমের যে প্রসিদ্ধ আয়াতটি নাযিল হয় তা হচ্ছে ‘আমি আজ তোমাদের ধর্মকে তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিলাম:

এবং যে সব আধ্যাত্মিক পুরস্কার খোদা তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাগণের জন্য অবতীর্ণ হতে পারে তা সমস্তই তোমার উম্মতের জন্য দান করলাম। তাছাড়া এটাও ফয়সালা করে দেওয়া হলো যে, তোমাদের ধর্ম শুধু মাত্র আল্লাহ্ তাআলার আনুগত্যের উপরে স্থাপিত’ (সূরা মায়েদা: ৩)। এই আয়াত তিনি (সা.) মুজদালেফার ময়দানে হজ্জের উদ্দেশ্যে সমবেত সমস্ত লোকের সামনে উচ্চ:স্বরে পাঠ করে শোনান। মুজদালেফা থেকে ফেরার পরে হজ্জের রীতি অনুযায়ী তিনি মদীনাতে থামেন এবং ১১ই যিলহজ্জ তারিখে তিনি (সা.) সমবেত সমস্ত মুসলমানদের সামনে দাঁড়িয়ে এক ভাষণ দান করেন। এই ভাষণে তিনি (সা.) বলেন:

‘হে লোক সকল! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোন। কেননা, আমি জানি না যে, এই বৎসরের পর আর কখনও আমি এই ময়দানে তোমাদের সাথে দাঁড়িয়ে আর কোনও বক্তৃতা দিতে পারবো কিনা।

‘আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের জীবন ও তোমাদের সম্পদ একে অপরের হামলা থেকে কেয়ামত পর্যন্ত পবিত্র ও নিরাপদ করে দিয়েছেন।

‘আল্লাহ্ তাআলা প্রত্যেক ব্যক্তির উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারিত করে দিয়েছেন। এ ধরনের কোন ওসীয়্যত বৈধ হবে না, যা কোন বৈধ উত্তরাধিকারীর ক্ষতির কারণ হয়।

‘যার ঘরে যে সন্তান পয়দা হবে, সে তারই সন্তান হবে। এবং কেউ যদি এই সন্তানের পিতৃত্বের উপরে দাবী উত্থাপন করে, তাহলে সে শরীয়ত মোতাবেক প্রাপ্য শাস্তি ভোগ করবে।

‘যে ব্যক্তি অন্য কাউকে নিজের পিতা বলে দাবী করবে, কিংবা কাউকে নিজের মালিক বলে মিথ্যা দাবী করবে, তার উপরে খোদার এবং ফেরেশতাদের এবং সকল মানুষের অভিশাপ বর্ষিত হবে।

‘হে লোক সকল! তোমাদের স্ত্রীদের উপরে তোমাদের যেমন হক্ (অধিকার) আছে তেমনি তোমাদের উপরেও তোমাদের স্ত্রীদের হক্ (অধিকার) আছে। তাদের উপরে তোমাদের অধিকার হচ্ছে যে, তারা সতীত্ব বজায় রেখে জীবন যাপন করবে। এবং তারা এমন অশালীন কিছু করবে না, যাতে মানুষের সামনে তাদের স্বামীদের কোনও সম্মানহানি ঘটে। এ জাতীয় কিছু যদি তারা করে, তাহলে তোমরা (কুরআন করীমের নির্দেশ অনুযায়ী তা যাচাই করবে এবং আদালতের ফয়সালা মোতাবেক) তাদেরকে শাস্তি দিবে, কিন্তু তাতে কোন বাড়াবাড়ি করবে না। কিন্তু, যদি তারা এমন কিছু না করে, যা তাদের স্বামী ও বংশের জন্য অবমাননার কারণ হয়, তাহলে তোমাদের কর্তব্য হবে, তোমাদের সাধ্যমত তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদির সুবন্দোবস্ত করা। মনে রাখবে যে, সর্বদাই নিজেদের স্ত্রীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে। কেননা, খোদা তাআলা তাদের দেখাশুনা করার দায়িত্ব তোমাদের উপরে ন্যস্ত করেছেন। নারীরা দুর্বল, তারা তাদের অধিকার নিজেরা রাক্ষা করতে পারে না। কাজেই, তোমরা যখন তাদেরকে বিবাহ করো, তখন খোদা তাআলা তাদের অধিকার রক্ষার জন্য তোমাদেরকে জামিন নিযুক্ত করে দেন। খোদা তাআলার  আইন মোতাবেক তোমরা তাদেরকে তোমাদের ঘরে নিয়ে আস। অতএব, খোদা তাআলার অর্পিত সেই জামানতের কখনই খেয়ানত করবে না। এবং স্ত্রীদের অধিকার রক্ষার প্রতি সর্বদাই সতর্ক দৃষ্টি রাখবে।

‘হে লোক সকল! তোমাদের হাতে এখনও কিছু যুদ্ধবন্দী রয়ে গেছে। আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি যে, তোমরা তাদেরকে তা-ই খাওয়াবে যা তোমরা নিজেরা খাও। এবং তাদেরকে তা-ই পরতে দিবে, যা তোমরা নিজেরা পর। যদি তারা এমন কোন অপরাধ করে ফেলে, যা তোমরা ক্ষমা করতে পার না, তাহলে তাদেরকে অন্যের কাছে দিয়ে দিবে। কেননা, তারা খোদারই বান্দা। তাই, কোনও অবস্থাতেই তাদেরকে কোনরূপ কষ্ট দেওয়া বৈধ হবে না।

‘হে লোক সকল! আমি তোমাদের যা বলছি, তা শোন এবং ভালভাবে মনে রেখো।

‘প্রত্যেক মুসলমান প্রত্যেক মুসলমানের ভাই। তোমরা সবাই সমান। সব মানুষ, তা তারা যে কোন জাতিরই হোক আর যে ধর্মেরই হোক, মানুষ হওয়ার কারণে, পরস্পর সমান।  - (এই কথা বলার সময় তিনি (সা.) তাঁর উভয় হাত উপরে তুললেন এবং এক হাতের আঙ্গুলগুলিকে অপর হাতের আঙ্গুলগুলির সঙ্গে মিলালেন এবং বললেন) যেভাবে দুই হাতের আঙ্গুলগুলি পরস্পর সমান, সে ভাবেই সকল মানুষ পরস্পর সমান।

‘তোমাদের কোন অধিকার নেই যে, তোমরা একে অন্যের উপরে কোন শ্রেষ্ঠত্বের দাবী কর। তোমরা পরস্পর ভাই।’

তিনি (সা.) আবার বলেন :

‘তোমরা কি জান, এখন কোন্ মাস? এই এলাকা কোন্ এলাকা? তোমাদের কি জানা আছে, আজকের দিন কোন্ দিন?’

লোকেরা উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, এই মাস পবিত্র মাস। এই এলাকা পবিত্র এলাকা। আজকের দিন হজ্জের দিন।’

তাদের সকলেরই উত্তর শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলতে থাকলেন,

‘যেভাবে এই মাস পবিত্র মাস, যেভাবে এই এলাকা পবিত্র এলাকা, যেভাবে এই দিন পবিত্র দিন, তেমনিভাবে আল্লাহ্ তাআলা প্রতিটি মানুষের জান, মাল ও সম্মান পবিত্র করে দিয়েছেন। এবং কারো জানের উপরে কিংবা মাল ও সম্মানের উপরে হামলা করা ঠিক তেমনি অবৈধ যেমন অবৈধ এই মাসের এই এলাকায় এই দিনের অমর্যাদা করা। এই হুকুম শুধু আজকের জন্যই নয়, শুধু কালকের জন্যই নয়, বরং সেই দিন পর্যন্ত প্রত্যেক দিনের জন্য যেদিন তোমরা খোদার সঙ্গে গিয়ে মিলিত হবে’।

তিনি (সা.) আরও বললেন,

‘এই সমস্ত কথা যা আমি আজ তোমাদেরকে বলছি তা তোমরা পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে দিও। কেননা, এমনও হতে পারে যে, যারা আজ আমার কথা আমার কাছ থেকে শুনছে, তাদের চাইতে যারা আমার কাছ থেকে আমার এই কথা শুনছে না, তারা এই সকল কথার উপরে বেশি আমল করবে, বেশি বেশি পালন করবে।’

এই সংক্ষিপ্ত ভাষণ বলে দিচ্ছে যে, মানুষের মঙ্গল এবং তাদের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য রাসূলে করীম (সা.) কত বেশী উদ্বিগ্ন ছিলেন। এবং নারীজাতি ও দুর্বলের অধিকার রক্ষার প্রতি কত বেশি আন্তারিক ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) জানতেন যে, তাঁর ইহজীবনের দিন শেষ হয়ে আসছে। হয়তো বা আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর জীবনের সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তাই, তিনি চান নি যে, যে নারীদেরকে মানব জন্মের আদি থেকেই পুরুষদের দাসী বানিয়ে রাখা হয়েছে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আদেশ-নির্দেশ দেওয়ার পূর্বেই তিনি জগৎ ছেড়ে চলে যান। তিনি চেয়েছিলেন যে, ঐ সকল যুদ্ধবন্দী যাদেরকে মানুষেরা ক্রীতদাস বলে আখ্যায়িত করে, এবং যাদের উপরে নানা প্রকার অত্যাচার চালাতে থাকে, তাদের অধিকার সুরক্ষিত করার পরই তিনি যেন দুনিয়া চেড়ে চলে যান। তিনি চান নি যে, মানুষে মানুষে যে প্রকাশ্য প্রার্থক্য সৃষ্টি করা হয়েছে, কাউকে পাতালে নিক্ষেপ করা হয়েছে, তা ঘুচিয়ে দেওয়ার আগে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তিনি চান নি যে সকল কারণে, জাতিতে, জাতিতে দেশে দেশে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং যুদ্ধ বিগ্রহের সৃষ্টি হয়, তা সব সাকল্যে দূরীভূত করার আগে তিনি এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। একে অপরের হক্ আত্মসাৎ করা বা অধিকার খর্ব করা সব সময়েই বর্বর যুগের এক অভিশাপ বলে গণ্য করা হয়, তার অশুভ বাসনাকে যতক্ষণ না হত্যা করা হয়, ততক্ষণ তিনি পৃথিবী ছেড়ে যেতে চান নি। যতক্ষণ পর্যন্ত না মানুষের জান ও মালকে সেই পবিত্রতা সেই নিরাপত্তা দান না করা হয়, যা খোদা তাআলার পবিত্র মাসগুলোকে খোদা তাআলার পবিত্র ও কল্যানমন্ডিত স্থানসমূহকে দান করা হয়েছে, ততক্ষণ তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চান নি।     

নারীকে পুরুষের সমমর্যাদা দান, সব জাতির জন্য নিরাপত্তা ও শান্তি স্থাপনকরণ, মানবজাতির মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠাকরণ ইত্যাদির জন্য এত বেশি গভীর উদ্বেগ ও আন্তরিকতা পৃথিবীর আর কোনও মানুষের মাঝে কেউ কি কখনও দেখেছে? হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মানবজাতির জন্য এত ভালবাসা, এত আকুলতা, এত সংকল্প আর কোন মানুষের মধ্যে কি কখনও দেখা গেছে? এসব কারণেই তো ইসলামের মধ্যে নারীরা তাদের সম্পত্তির মালিক। যে মালিকানা অর্জন করতে পেরেছে ইউরোপ ইসলামের তেরশ’ বছর পরে। এর কারণেই তো ইসলাম গ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তি অন্য সবার সমান হয়ে যায়, তা স যত ছোট এবং যত নীচ জাতের লোকই হোক না কেন। স্বাধীনতা ও সাম্যের শিক্ষা ও আদর্শ কেবল ইসলাম, হ্যাঁ, কেবল ইসলামই কায়েম করেছে পৃথিবীতে। এবং এমনভাবে কায়েম করেছে যে, আজ পর্যন্ত দুনিয়ার আর কোন জাতি তা করতে পারে নি। আমাদের মসজিদে একজন সম্রাট কিংবা একজন সম্মানিত ধর্মীয় নেতা একজন সাধারণ মানুষের সমান। সেখানে তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য বা কোন ভেদাভেদ নেই। অথচ, অন্যান্য ধর্মের উপাসনাগুলোতে বড় ও ছোটর মধ্যে ভেদাভেদ আজও অব্দি বজায় রয়েছে। যদি সেই জাতিগুলি স্বাধিকার ও সাম্যের কথা মুসলমানদের চাইতে অনেক বেশি জোর গলায় প্রচার করে চলেছে।

হযরত রাসূল করীম (সা.)-এর ওফাত

হজ্জের সফর থেকে ফিরে আসার সময় পথিমধ্যে হযরত রাসূল (সা.) সাহাবীদের (রা.) কাছে তাঁর ওফাতের খবর দিলেন। তিনি (সা.) বললেন, ‘হে লোক সকল!  আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আল্লাহ্র ডাক আমার খুব নিকটবর্তী হয়েছে। এবং আমাকে এই ডাকে সাড়া দিতে হবে।’

তিনি (সা.) বললেন,  

‘আমাকে আমার মেহেরবান ও সদাসতর্ক প্রভু খবর দিয়েছেন যে, একজন নবী তাঁর পূর্ববর্তী নবীর অর্ধেক বয়স পেয়ে থাকেন। [রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে বলা হয়েছিল যে, হযরত ঈসা (আ.)-এর বয়স কম বেশি ১২০ বছর। এত্থেকে তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে, তাঁর কমপক্ষে ৬০ বছর হবে। ঐ সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২/৬৩ বছর। তিনি এতদ্বারা এই ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন যে, তাঁর আয়ু হয়ে এসেছে। তবে এই কথার তাৎপর্য এই নয় যে, প্রত্যেক নবীই তাঁর পূববর্তী নবীর অর্ধেক আয়ু পেয়ে থাকেন। এই হাদীসে আঁ হযরত (সা.) শুধু ঈসা (আ.)-এর বয়সের কথা উল্লেখ করেছিলেন, এবং তা করেছিলেন তিনি তাঁর নিজের বয়সের ধারণা দেওয়ার জন্য] তাই আমার মনে হচ্ছে খুব শীগগীর আমার ডাক আসবে। এবং আমাকে যেতে হবে।’

‘হে আমার সাথীরা! আমি যখন খোদার সামনে প্রশ্নের সম্মুখীন হবো, তখন তোমরা কি বলবে?

তারা (রা.) বললেন :

‘ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমরা বলবো যে, আপনি ইসলামের তবলীগ অতি উত্তমরূপে করেছেন। এবং আপনি আপনার জীবন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র দীনের খেদমতে নিয়োজিত রেখেছিলেন। এবং আপনি মানব জাতির কল্যাণসাধনকে পরিপূর্ণতা দান করেছেন। আল্লাহ্! তুমি তাঁকে আমাদের পক্ষ থেকেও উত্তম থেকে উত্তম পুরস্কারসমূহে ভূষিত কর’।

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন :

‘তোমরা কি এই কথার সাক্ষ্যদান করছো না যে, আল্লাহ্ এক, এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রসূল; বেহেশ্ত সত্য, দোযখ সত্য এবং নিশ্চয় প্রত্যেক মানুষের জন্য মৃত্যু আসে, এবং মৃত্যুর পর প্রত্যেক মানুষ জীবন লাভ করবে এবং কেয়ামতও নিশ্চয় আসবে, এবং সকল মানব সন্তানকে আল্লাহ্ তাআলা কবর থেকে পুনরায় জীবিত করে একত্র করবেন?’

তাঁরা (রা.) বললেন : ‘হ্যাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমরা এই সকল কথারই সাক্ষ্য দান করছি। অত:পর তিনি (সা.) আল্লাহ্কে সম্বোধন করে বললেন :

‘তুমিও সাক্ষী থেকো যে, আমি তাদের কাছে ইসলামের নীতি-নিয়ম সব সবিস্তারে পৌঁছে দিয়েছি।’

রাসূলে করীম (সা.) এই হজ্জ থেকে ফিরে এসে মুসলমানদেরকে তালীম-তরবিয়ত বা শিক্ষা-প্রশিক্ষণ ও চরিত্র গঠনের কাজে এবং তাদের আমল বা কর্ম ও আচরণের সংশোধনের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। এবং মুসলমানকে তাঁর মৃত্যুর দিনের জন্য তৈরী করতে থাকলেন। একদিন তিনি বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন এবং বললেন;

আজ আমার প্রতি আল্লাহ্ তাআলার কাছ থেকে এই ওহী অবতীর্ণ হয়েছে :

(সূরা নাসর) Ñঐদিনের কথা মনে রেখো, যখন আল্লাহ্ তাআলার সাহায্য এবং তাঁর পক্ষ থেকে বিজয় অতীতের চেয়ে আরও বেশি করে আসবে এবং প্রত্যেক জাতি ও গোষ্ঠীর লোকেরা ইসলামের মধ্যে দলে দলে প্রবেশ করতে শুরু করবে। অতএব হে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এবং তুমি তোমার খোদা তাআলার প্রশংসা করতে থাক এবং তাঁর কাছে এই প্রার্থনা করো যে, ধর্মের যে বুনিয়াদ তুমি স্থাপিত করেছ তার মধ্যে থেকে তিনি যেন সকল প্রকারের কমতি ও দুর্বলতা দূর করে দেন। যদি তুমি এই দোয়া করতে থাক, তাহলে খোদা তাআলা অবশ্যই তোমাদের দোয়া শুনবেন।

অত:পর তিনি (সা.) বললেন : খোদা তাআলা তাঁর এক বান্দাকে বলেছিলেন,

‘ইচ্ছা করলে তুমি আমার কাছে চলে আসতে পার, কিংবা ইচ্ছা করলে তুমি দুনিয়ার সংশোধনের কাজে আরও কিছুদিন থেকে যেতে পার। এই উত্তরে খোদার সেই বান্দা বলেছিল, ‘আমি আমি আপনার কাছে যাওয়াকেই বেশি পসন্দ করি।’

এই কথা যখন আঁ হযরত (সা.) উপস্থিত সাহাবাগণের (রা.) কাছে বললেন, তখন হযরত আবু বকর (রা.) কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। এতে সাহাবারা সবাই এই ভেবে বিস্মিত হয়ে গেলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তো বিজয়ের কথাই বলেছেন অথচ আবু বকর (রা.) কাঁদছেন কেন? হযরত উমর (রা.) বলেছেন, আমি বলেই ফেললাম, এই বুড়োর হলোটা কি? খুশীর খবর শুনে কাঁদছে কেন?’ কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা.) জানতেন যে, আবু বকরই তাঁর কথা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারতেন। তাই তিনিই (রা.) কেবল এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই সূরার মধ্যে আঁ হযরত (সা.)-এর ওফাতের সংবাদ দেওয়া হয়েছে।

হযরত রাসূল করিম (সা.) বললেন : ‘আবু বকর আমার কাছে খুবই প্রিয়। যদি আল্লাহ্ ছাড়া আর কাউকে সীমাহীনভাবে ভালবাসা বৈধ হতো, তাহলে আমি সেভাবেই আবু বকরকে ভালবাসতাম।’

‘হে লোক সকল! মসজিদে যত লোকের জন্য দরজা খোলা হতো আজ থেকে সেই সব দরজাই বন্ধ হয়ে যাবে, একমাত্র আবু বকরের দরজা খোলা থাকবে।’

এই কথার মধ্যে এই ভবিষ্যদ্বাণী নিহিত ছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পর প্রথম খলীফা হবেন হযরত আবু বকর (রা.) এবং নামায পড়াবার জন্য মসজিদে ঐ দরজা দিয়ে তাঁকেই (রা.) আসতে হবে।

অবশেষে সেই দিন এসে গেল, যা প্রত্যেক মানুষেরই জন্য আসে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দুনিয়াতে তাঁর কাজ সম্পূর্ণ করেছেন। আল্লাহ্র বাণী সম্পূর্ণরূপে এবং সফলরূপে নাযিল হয়েছে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্  (সা.)-এর পবিত্রকরণ শক্তি দ্বারা একটি নতুন জাতির এবং সেই সঙ্গে এক নতুন আসমান ও এক নতুন যমীনের বুনিয়াদ স্থাপন করা হয়েছে। বপনকারী যমীনে হাল দিয়েছেন, পানি দিয়েছেন এবং বীজ বপন করেছেন এবং ফসল উৎপন্ন হয়েছে। এখন ফসল তোলার জিম্মা তাঁর নয়। তিনি ছিলেন একজন মজদুরের মত। এবং একজন মজদুরের মতই এই দুনিয়া ছেড়ে তিনি চলে যাবেন। কেননা, তাঁর পুরস্কার এই দুনিয়ার কোন বস্তু নয়। বরং তাঁর পুরস্কার হচ্ছে তাঁর স্রষ্টা ও তাঁর প্রেরণকর্তার সন্তুষ্টি। যখন ফসল তোলার সময় এলো, তখন তিনি তাঁর প্রভুর কাছে এটাই বল্লেন, তাকে যেন দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। এবং ফসল যেন অন্যেরা তোলে।

রাসূলুল্লাহ্  (সা.) অসুস্থ অবস্থায়ও কিছুদিন কষ্ট করেই মসজিদে নামায আদায় করতে আসতে থাকলেন। কিন্তু শেষে মসজিদে আসার সেই শক্তিটুকুও আর রইলো না। সাহাবীরা (রা.) কখনই এটা চিন্তা করতে পারতেন না যে, তিনি (সা.) মারা যাবেন যদিও তিনি (সা.) তাঁদেরকে বরাবর তাঁর আসন্ন মৃত্যুর খবর দিচ্ছিলেন। একদিন সাহাবারা (রা.) সকলেই বসা ছিলেন, তখন রাসূলে করীম (সা.) বললেন :

‘কোন ব্যক্তির যদি কোন ভুল হয়ে যায়, তবে তার সংশোধন দুনিয়াতে হওয়াই ভাল, যাতে তাকে আর খোদার সামনে লজ্জিত হতে না হয়। যদি আমার দ্বারা অজান্তে কখনও কারো কোন ক্ষতি হয়ে গিয়ে থাকে, তবে সে তা এখন পূরণ করে নিক। কিংবা আমি যদি কাউকে না বুঝে সুঝে কোন কষ্ট দিয়ে থাকি, তবে সে তার প্রতিশোধ আজ নিয়ে নিক। কেননা, আমি চাই না যে, আমি খোদা তাআলার সামনে লজ্জিত হই। একথা শুনে তো সাহাবীরা বিব্রত ও বিচলিত হয়ে পড়লেন, এবং তাঁরা সবাই এটাই ভাবতে লাগলেন যে, হায়! হায়! কীভাবে কত কষ্ট করে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহো আলায়হে ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে আরামে রাখবার জন্য প্রাণপথ চেষ্টা করতেন। কীভাবে তিনি নিজে না খেয়ে তাদেরকে খেতে দিতেন, নিজের কাপড়ে তালি লাগিয়ে লাগিয়ে তাদেরকে কাপড় পড়তে দিতেন। তথাপি তিনি তাদেরকে বলছেন, যদি তিনি কখনও না বুঝে সুঝে কারো কোনও ক্ষতি করে থাকেন বা কাউকে কোন কষ্ট দিয়ে থাকেন, তাহলে সে যেন তার বদলা আজ নিয়ে নেয়। কিন্তু দেখা গেল, একজন সাহাবী এগিয়ে এলেন এবং বললেন :

‘ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আপনি আমাকে কষ্ট দিয়েছিলেন, যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধ হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছিল। আপনি লাইন থেকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন আপনার কনুই আমার শরীরে লেগেছিল। যেহেতু আপনি বলছেন যে, সামান্য হলেও যদি আপনি কাউকে কোন কষ্ট দিয়ে থাকেন, তারাও প্রায়শ্চিত্ত পৃথিবীতে হয়ে যাওয়াই ভাল, সেহেতু আমি আমার সেই কষ্টের প্রতিশোধ নিতে চাই।’

উপস্থিত সকল সাহাবী (রা.) যাঁরা শোকের সাগরে নিমগ্ন হয়ে ছিলেন, তৎক্ষণাৎ তাঁদের অবস্থায় পরিবর্তন ঘটে গেল। তাঁদের চোখে রক্ত উঠে গেল এবং প্রত্যেকেই মনে করলেন যে, এই ব্যক্তি যে এই সময়ে উপদেশ গ্রহণের পরিবর্তে এই ধরনের কথা বলছে, সে কঠিন শাস্তিরযোগ্য। কিন্তু ঐ সাহাবী কোন পারওয়াই করলেন না।

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন, ‘তুমি ঠিক বলছো। তোমার অধিকার আছে, প্রতিশোধ গ্রহণ করো।’

এই কথা বলে তিনি পাশ ফিরলেন এবং তাঁর পিঠ ঐ সাহাবীর দিকে দিয়ে বললেন, ‘তুমি আমাকে কনুই মেরো।’ সেই সাহাবী বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আপনার কনুই যখন আমার পিঠে লেগেছিল, তখন আমরা শরীর নাংগা ছিল, কেননা তখন আমার কাছে পরার মত কোন জামা ছিল না।’

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন, ‘ঠিক আছে, আমার গায়ের কোর্তাটা উঠিয়ে আমার নাংগা শরীরে কনুই মেরে তোমার প্রতিশোধ নিয়ে নাও। সেই সাহাবী তাঁর শরীরের কোর্তা উঠালেন এবং তিনি (রা.) তাঁর দুই কম্পিত ঠোঁট ও অশ্রু ঝরানো চোখ নিয়ে আঁ হযরত (সা.)-এর পিঠে চুম্বন দিলেন।’

রাসূলুল্লাহ্  (সা.) বললেন, ‘এ তুমি কি করছো?’

ঐ সাহাবী বললেন, আপনি যখন বলছেন যে, আপনার মৃত্যু নিকটবর্তী, তখন আপনাকে স্পর্শ করবার এবং আপনাকে আদর করবার সুযোগ আমি আর কখন পাব? সন্দেহ নেই, যুদ্ধের সময় আমাকে আপনার কনুই লেগেছিল বটে, কিন্তু কার প্রাণ চাইবে যে, সেই কনুই লাগার বদলা নিয়ে নেয়? আমার মনে হলো, রাসূলুল্লাহ্  (সা.) যখন বলছেন যে, আজ তাঁর কাছ থেকে প্রতিশোধ নেয়া যাবে, তখন না আমি কেন এই বাহানায় তাঁকে একটু আদর করে নি? (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী)

যে সকল সাহাবী এতক্ষণ ক্রোধে অস্থির হয়েছিলেন, এ কথা শুনে তাঁদের প্রত্যেকের হৃদয়ে এই আফসোসে ভরে গেল যে, ‘আহা, এই সুযোগ যদি আমিও পেতাম।’

অসুখ বাড়তে থাকলো। মৃত্যুও নিকটতর হতে থাকলো। মদীনায় আগের মতই সূর্য উঠেছিল, আগের মতই আলো ছড়াচ্ছিল। কিন্তু সাহাবীদের অন্ধকার মেঘ ঘনায়ে আসছিল। দিনের আলো বৃদ্ধি পাচ্ছিল, সাহাবাদের চোখের সামনে আঁধারের পর্দা ভারী হয়ে উঠেছিল। অবশেষে সেই সময় এসে গেল, যখন আল্লাহ্র রাসূল (সা.) রূহ দুনিয়া ছেড়ে আপন স্রষ্টার সমীপে গিয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হতে লাগলো, শ্বাস নিতে তাঁর কষ্ট হতে লাগলো। রাসূলুল্লাহ্  (সা.) হযরত আয়েশা (রা.) বললেন,

‘আমার মাথা তোমার বুকের উপর উঠিয়ে নাও। শুয়ে শুয়ে শ্বাস নিতে আমার কষ্ট হচ্ছে।’

হযরত আয়েশা (রা.) তাঁর মাথা বুকে তুলে নিয়ে হেলান দিয়ে বসলেন। মৃত্যুর কষ্ট তাঁর (সা.) উপরে প্রভাব বিস্তার করছিল। তিনি (সা.) একবার এদিক একবার ওদিক মাথা নাড়াচ্ছিলেন এবং বলছিলেন, ‘আল্লাহ্র লানত ইহুদীদের ও নাসেরাদের উপরে, কেননা, তারা তাদের নবীদের মৃত্যুর পর তাঁদের (আ.) কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়েছে’ অর্থাৎ কবরগুলোকে পূজো করছে)। (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী)

এটাই ছিল, আঁ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের শেষ উপদেশ তাঁর উম্মতের জন্য। তাঁর উম্মতের প্রতি তাঁর শেষ উপদেশ ছিল, ‘তোমরা আমাকে সকর নবীর চাইতে বেশি মর্যাদায় দেখতে পাবে, সকলের চাইতে বেশি সফলকাম দেখতে পাবে, তোমরা এটা কখনও ভুলে যেও না যে, আমি আল্লাহ্র বান্দা। মনে রাখবে, খোদার মাকাম খোদারই। আমার কবরকে তোমরা কখনও একটা কবরের চেয়ে বেশি কিছু মনে করো না। অন্যান্য উম্মতেরা তাদের নবীদের কবরগুলোকেই মসজিদ বানিয়ে সেখানে বসে তারা চিল্লাকুশী করে নযরনেয়াজ দেয়। কিন্তু তোমরা এসব কখনই করবে না। তোমাদেরকে খাড়া করা হয়েছে আল্লাহ্র ইবাদত করার জন্য।’

এই কথাগুলি বলার সময় তাঁর (সা.) চোখ বন্ধ হয়ে আসল এবং তাঁর (সা.) মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল :

(আমি আরশে মোয়াল্লায় অধিষ্ঠিত আমার দয়াল বন্ধুর কাছে যাচ্ছি) : এই কথা বলতে বলতে তাঁর (সা.) রূহ দেহ ছেড়ে চলে গেল। (হযরত মির্যা বশিরুদ্দীন (রা.) লিখিত নবীনেতা হযরত মুহাম্মদ (সা.) পুস্তক  অবলম্বনে)


 

Video Advert

সপ্তাহের অনুষ্ঠান

) আগামী ৯ জুন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের দ্বি - বার্ষিক সাধারণ সভা ও নির্বাচন । অনুষ্টিত হবে পূর্ব লন্ডেনর ৫৯৩  বার্কিং রোড়স্থ এম্পায়ার ভেন্যুতে  । 

 

সৌজন্যে : NEEMO EXPRESS

Live ETV X 24 Hours

Watch live streaming video from ekusheytvbd at livestream.com

কমিউনিটি সংবাদ

 

ভিজিটর অনলাইন

আমাদের সাথে আছে 1154 অতিথি অনলাইন
www.dobazar.com
feedback